রাত তখন ৩টা ৭ মিনিট।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
শুধু জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
রাফি বিছানায় শুয়ে মোবাইল দেখছিল। হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল।
অচেনা একটা নম্বর।
রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কলটা রিসিভ করল।
— “হ্যালো?”
ওপাশ থেকে কোনো কথা নেই।
শুধু একটা মেয়ের কান্নার শব্দ।
রাফি আবার বলল,
— “কে বলছেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর মেয়েটি খুব নিচু গলায় বলল,
— “রাফি... তুমি কি আমাকে ভুলে গেছ?”
রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এই কণ্ঠটা...
এই কণ্ঠ সে খুব ভালো করেই চেনে।
মেয়েটির নাম ছিল নীলা।
কিন্তু নীলা তো...
দুই বছর আগে মারা গেছে।
রাফি তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিল।
তার হাত কাঁপছিল।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—
“হয়তো কেউ মজা করছে।”
কিন্তু ঠিক তখনই আবার ফোন এল।
একই নম্বর।
রাফি এবার কল ধরল না।
ফোনটা বন্ধ করে বালিশের পাশে রেখে চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ পর—
টক... টক... টক...
জানালায় কেউ যেন আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছে।
রাফি ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
তার ঘরের জানালা ছিল তিনতলায়।
সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়।
টোকাটা আবার হলো।
টক... টক... টক...
রাফি সাহস করে জানালার দিকে তাকাল।
কাঁচের ওপারে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেজা চুল মুখ ঢেকে রেখেছে।
সাদা পোশাক।
রাফির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
আর রাফি দেখল—
ওটা নীলা।
রাফি চিৎকার করতে চেয়েও পারল না।
নীলা জানালার ওপাশ থেকে শুধু হাত দিয়ে একটা ইশারা করল।
“দরজা খোলো।”
রাফি পেছনে সরে গেল।
ঠিক তখনই তার ফোন আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে লেখা—
নীলা কলিং...
রাফি কাঁপা হাতে কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে নীলার কণ্ঠ—
— “জানালার দিকে তাকিও না।”
রাফির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু বৃষ্টিতে ভেজা কাঁচ।
রাফি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— “তুমি যদি নীলা হও... তাহলে জানালার বাইরে কে ছিল?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নীলা বলল,
— “আমি জানি না।”
— “তাহলে তুমি আমাকে ফোন করছ কেন?”
মেয়েটি এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “কারণ ও এবার তোমার কাছে এসেছে।”
রাফির শরীর শিউরে উঠল।
— “ও কে?”
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
— “তুমি কি মনে করতে পারো, আমি মারা যাওয়ার আগের রাতে তোমাকে কী বলেছিলাম?”
রাফি চোখ বন্ধ করল।
দুই বছর আগের সেই রাতটা তার মনে পড়ে গেল।
নীলা তখন খুব ভয় পেয়েছিল।
ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—
“রাফি, আমার ঘরে কেউ আছে।”
রাফি ভেবেছিল নীলা হয়তো ভয় পেয়েছে।
সে বলেছিল,
“দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ো।”
পরদিন সকালে খবর এসেছিল—
নীলা মারা গেছে।
তার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
কোনো চোর ঢোকার চিহ্ন ছিল না।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল—
নীলার ফোনে শেষ কলটি ছিল রাফির নম্বর থেকে।
হঠাৎ রাফির ঘরের লাইট নিভে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
তারপর অন্ধকারের মধ্যে—
একটা মেয়ের হাসির শব্দ।
রাফি বিছানার ওপর বসে পড়ল।
তারপর তার কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলল,
— “তুমি সেদিনও দরজা খোলোনি...”
রাফি জমে গেল।
এই কণ্ঠটা নীলার নয়।
সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
অন্ধকারে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেজা চুল।
সাদা পোশাক।
কিন্তু এবার মুখটা দেখা যাচ্ছে।
মুখটা নীলার নয়।
মেয়েটি হাসল।
— “আজও কি দরজা খুলবে না?”
ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে—
নীলা কলিং...
রাফি কাঁপতে কাঁপতে কল ধরল।
ওপাশ থেকে নীলা চিৎকার করে বলল—
— “রাফি! যাকে তুমি দেখছ, সে আমি নই!”
রাফি চোখ বন্ধ করে ফেলল।
তারপর নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— “দুই বছর আগে আমার সঙ্গে যে জিনিসটা ছিল... সেটা এখন তোমার ঘরে।”
রাফির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে জিজ্ঞেস করল,
— “তাহলে তুমি কোথায়?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নীলার কণ্ঠ খুব ধীরে শোনা গেল—
— “আমি তোমার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।”
রাফির চোখ ধীরে ধীরে দরজার দিকে গেল।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে...
পানি ঢুকছে।
যেন বাইরে কেউ বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে আছে।
রাফি দরজার কাছে গিয়ে নিচে তাকাল।
পানির মধ্যে ধীরে ধীরে একটা ছায়া তৈরি হলো।
তারপর দরজার ওপাশ থেকে নীলার কণ্ঠ—
— “রাফি... দরজা খোলো।”
রাফি কাঁপা গলায় বলল,
— “তুমি সত্যিই নীলা?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
“হ্যাঁ।”
ঠিক একই মুহূর্তে রাফির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—
— “মিথ্যা বলছে।”
রাফি ঘুরে তাকাল।
মেয়েটা এবার আর মানুষটার মতো দেখাচ্ছে না।
তার মুখ ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে।
আর তার হাতে ধরা রাফির পুরোনো একটা ছবি।
ছবিটায় রাফি আর নীলা দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু ছবির পেছনে...
আরেকজন মেয়েকে দেখা যাচ্ছে।
রাফি মেয়েটাকে চিনতে পারল।
তারপর তার মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ বের হলো—
“মা...”
মেয়েটা মুচকি হাসল।
আর সেই মুহূর্তে ঘড়িতে বাজল—
রাত ৩টা ৭ মিনিট।
পরদিন সকালে রাফির ঘর থেকে শুধু তার মোবাইলটা পাওয়া গেল।
ফোনের শেষ কল—
নীলা।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল...
কলটির সময়কাল ছিল—
২ বছর ০ মাস ০ দিন।
আর সেই রাত থেকে প্রতি বছর একই সময়ে রাফির নম্বর থেকে একটা ফোন যায় নীলার নম্বরে।
ফোন ধরলে ওপাশ থেকে শুধু একটি কণ্ঠ শোনা যায়—
“এবার তোমার পালা...” 👻

Comments
Post a Comment