রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
পুরো বাড়ি নীরব। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে আত্মীয়-স্বজনের হাসি, গল্প আর হৈচৈ ছিল, এখন সেখানে শুধু নিস্তব্ধতা।
নিজের ঘরে বিছানার এক পাশে বসে ছিল মায়া। গায়ে বিয়ের শাড়ি, হাতে মেহেদি, চোখে ক্লান্তির ছাপ।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকল রায়হান।
সারাদিনের ব্যস্ততায় দুজনের ঠিকমতো কথাই হয়নি।
রায়হান কিছুক্ষণ মায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল,
— “অনেক ক্লান্ত?”
মায়া মাথা নিচু করে বলল,
— “হুম।”
রায়হান পাশে বসে বলল,
— “আজ থেকে কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকতে হবে।”
মায়া কোনো উত্তর দিল না।
রায়হান বুঝতে পারল, মেয়েটা অস্বস্তিতে আছে।
তাই একটু হেসে বলল,
— “ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে কোনো কিছুতে জোর করব না। আমরা আগে ভালো বন্ধু হই, তারপর বাকিটা সময়ের ওপর ছেড়ে দেব।”
মায়া এবার রায়হানের দিকে তাকাল।
তার চোখে অদ্ভুত একটা কষ্ট।
রায়হান সেটা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল,
— “কী হয়েছে?”
মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
— “আপনাকে একটা কথা বলব?”
— “অবশ্যই।”
মায়া গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
— “আমি আপনাকে ভালোবাসি না।”
কথাটা শুনে রায়হান কয়েক মুহূর্ত একদম চুপ হয়ে গেল।
মনে হলো, ঘরের সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— “আমি জানতাম।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “জানতেন?”
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
— “হ্যাঁ। তোমার চোখে আমি সেটা অনেক আগেই দেখেছি।”
মায়ার চোখে পানি চলে এল।
সে বলল,
— “তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?”
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “কারণ তোমার বাবা আমার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন। তোমার বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল, তুমি যেন এমন কারও কাছে থাকো যে তোমাকে সম্মান করবে।”
মায়া চোখের পানি মুছে বলল,
— “শুধু এই কারণেই?”
রায়হান মাথা নাড়ল।
— “না।”
— “তাহলে?”
রায়হান এবার মায়ার হাতে থাকা একটা ছোট্ট খাম তার দিকে এগিয়ে দিল।
— “এটা তোমার বাবার কাছ থেকে।”
মায়া কাঁপা হাতে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা ছোট চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
“মায়া, আমি জানি তুমি হয়তো এই বিয়েটা মন থেকে মেনে নিতে পারছ না। কিন্তু রায়হানকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। সে কখনো তোমার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে না। যদি কোনোদিন মনে হয় তুমি তাকে ভালোবাসতে পারবে না, তাহলে নির্দ্বিধায় তাকে ছেড়ে দিও। শুধু একটা কথা মনে রেখো—মানুষকে ভালোবাসার আগে তাকে চিনতে হয়।”
চিঠিটা পড়তে পড়তে মায়ার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— “বাবা এটা কখন লিখেছিলেন?”
রায়হান বলল,
— “তোমাদের বিয়ের কয়েকদিন আগে।”
মায়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “আপনি যদি জানতেন আমি আপনাকে ভালোবাসি না, তাহলে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলেন কেন?”
রায়হান জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “কারণ ভালোবাসা চেয়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু ভালোবাসার জন্য সময় দেওয়া যায়।”
মায়া কোনো উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে দুজন আলাদা পাশে ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই মায়া একটা জিনিস লক্ষ্য করতে শুরু করল।
রায়হান কখনো তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে না।
মায়া চা খেতে চাইলে চা বানিয়ে দেয়।
মায়া মন খারাপ করে থাকলে কারণ জানতে চায়, কিন্তু জোর করে না।
মায়ার পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে হলে কখনো বাধা দেয় না।
একদিন মায়া অসুস্থ হয়ে পড়ল।
রাতভর রায়হান তার পাশে বসে থাকল।
মায়া ঘুম ভেঙে দেখল, রায়হান চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তার হাতে তখনও ওষুধের প্যাকেট।
মায়া প্রথমবারের মতো মানুষটাকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করল।
দিন যেতে লাগল।
এক মাস।
দুই মাস।
তিন মাস।
একদিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল।
মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
হঠাৎ রায়হান এসে পাশে দাঁড়াল।
— “বৃষ্টি ভালো লাগে?”
মায়া হেসে বলল,
— “অনেক।”
রায়হান বলল,
— “তাহলে আজ বাইরে যাবে?”
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— “এই বৃষ্টিতে?”
— “হ্যাঁ।”
দুজন একটা ছাতার নিচে বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে মায়া হঠাৎ বলল,
— “রায়হান?”
— “হুম?”
— “একটা কথা বলব?”
— “বলো।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “মনে হয়… আমি ভুল করেছিলাম।”
রায়হান থেমে গেল।
— “কী ব্যাপারে?”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— “আমি ভেবেছিলাম ভালোবাসা প্রথম দেখাতেই হয়।”
রায়হান কিছু বলল না।
মায়া এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কিন্তু এখন বুঝেছি, ভালোবাসা কখনো কখনো ধীরে ধীরে তৈরি হয়।”
রায়হানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— “তাহলে?”
মায়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলল,
— “তাহলে… আমি মনে হয় আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
রায়হান মজা করে বলল,
— “মনে হয়?”
মায়া এবার হেসে ফেলল।
— “না। সত্যি।”
বৃষ্টির শব্দের মাঝে রায়হান শুধু বলল,
— “এই কথাটার জন্য আমি অনেকদিন অপেক্ষা করেছি।”
মায়া তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
— “আর আমি বুঝতেই অনেক দেরি করে ফেললাম।”
সেদিনের সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।
কেউ জানত না, এই সম্পর্কের শুরুটা ছিল ভালোবাসাহীন একটি বিয়ে।
কিন্তু শেষটা?
দুজন মানুষের এমন এক ভালোবাসা, যেটা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। ❤️

Comments
Post a Comment