ঘটনাটা প্রায় পাঁচ বছর আগের।
ঢাকার বাইরে একটা ছোট শহরে তখন চাকরি করতাম। অফিস শেষ হতে প্রায়ই রাত হয়ে যেত। বাসায় ফিরতে হলে একটা নির্জন রাস্তা দিয়ে যেতে হতো।
রাস্তাটা খুব বেশি বড় না।
দুই পাশে বড় বড় গাছ, মাঝখানে সরু পিচের রাস্তা। দিনের বেলা জায়গাটা বেশ স্বাভাবিকই লাগত। কিন্তু রাত হলেই পুরো রাস্তা যেন অন্যরকম হয়ে যেত।
বিশেষ করে রাত ২টার পর।
স্থানীয় মানুষজন বলত, ওই সময় রাস্তা দিয়ে একা না যেতে।
আমি এসব কথায় কখনো বিশ্বাস করতাম না।
এক রাতে অফিসে কাজের চাপ বেশি থাকায় বের হতে হতে রাত ২টা বেজে গেল।
সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল।
রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর মাঝে মাঝে গাছের পাতায় জমে থাকা পানি নিচে পড়ার শব্দ।
আমি বাইক চালিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম।
মেয়েটার পরনে সাদা-কালো একটা সালোয়ার-কামিজ।
চুলগুলো ভেজা।
সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি বাইকটা একটু ধীরে করলাম।
মেয়েটা হাত তুলে আমাকে থামার ইশারা করল।
আমি থামলাম।
— “আপু, এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
মেয়েটা খুব নিচু গলায় বলল,
— “ভাইয়া, আমাকে একটু সামনে নামিয়ে দেবেন?”
আমি বললাম,
— “কোথায় যাবেন?”
সে রাস্তার সামনে একটা জায়গার নাম বলল।
জায়গাটা আমার বাড়ির যাওয়ার পথেই পড়বে।
তাই আর কিছু ভাবলাম না।
— “উঠেন।”
মেয়েটা বাইকের পেছনে উঠে বসল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে ওঠার পর আমি বুঝতে পারলাম তার কাপড় থেকে প্রচণ্ড ভেজা মাটির গন্ধ আসছে।
আমি বাইক চালাতে শুরু করলাম।
কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে মেয়েটা বলল,
— “ভাইয়া…”
— “জি?”
— “আপনি কি প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যান?”
— “হ্যাঁ।”
— “রাত ২টার পরও?”
আমি হেসে বললাম,
— “কাজ থাকলে যেতে হয়।”
মেয়েটা আর কিছু বলল না।
কয়েক মিনিট পর আমি খেয়াল করলাম—
পেছনে বসা মেয়েটা একদম নড়ছে না।
এমনকি বাইকের ঝাঁকুনিতেও তার শরীর নড়ছে না।
আমি আয়নায় তাকালাম।
মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে।
চুল দিয়ে পুরো মুখ ঢাকা।
আমি বললাম,
— “আপু, আর কতদূর?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার বললাম,
— “আপু?”
এবার খুব ধীরে উত্তর এল,
— “আর একটু…”
কণ্ঠটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
কণ্ঠটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
আমি বাইকের গতি বাড়িয়ে দিলাম।
কিছুদূর যাওয়ার পর মেয়েটা হঠাৎ বলল,
— “ভাইয়া, এখানে থামান।”
আমি ব্রেক করলাম।
সে বাইক থেকে নেমে গেল।
আমি বললাম,
— “আপনার বাসা এখানেই?”
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু রাস্তার পাশের একটা পুরোনো বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বাইক চালিয়ে চলে এলাম।
বাড়িতে ফিরে ঘড়ির দিকে তাকালাম।
রাত ২টা ৪৭ মিনিট।
আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
কিন্তু ঘুম আসছিল না।
বারবার মনে হচ্ছিল—
মেয়েটার আচরণে কিছু একটা অস্বাভাবিক ছিল।
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা বললাম।
দোকানের বৃদ্ধ মালিক আমার কথা শুনে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন।
তারপর বললেন,
— “কোন রাস্তা দিয়ে আসছিলেন?”
আমি রাস্তার নাম বললাম।
বৃদ্ধ লোকটা আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “আপনি কি কাল রাতে একটা মেয়েকে বাইকে তুলেছিলেন?”
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
— “হ্যাঁ। আপনি জানলেন কীভাবে?”
লোকটা কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন,
— “মেয়েটা দেখতে কেমন ছিল?”
আমি তার পোশাক, ভেজা চুল—সব বললাম।
লোকটা মাথা নিচু করলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— “এই মেয়েটা পাঁচ বছর আগে ওই রাস্তায় মারা গেছে।”
আমার হাত থেকে চায়ের কাপ প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
— “কী বলছেন?”
বৃদ্ধ লোকটা বললেন,
— “এক রাতে বৃষ্টির মধ্যে একটা মেয়েকে গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিল। তখন রাত প্রায় ২টা ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যায়।”
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না।
লোকটা আবার বললেন,
— “তারপর থেকে মাঝেমধ্যে রাত ২টার দিকে ওই রাস্তার পাশে মেয়েটাকে দেখা যায়।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম,
— “কিন্তু… আমি তো তাকে বাইকে তুলে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেছি!”
বৃদ্ধ লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আপনি তাকে যে বাড়ির সামনে নামিয়েছেন, ওই বাড়িটা কি পুরোনো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “ওটা ওই মেয়েটার বাড়ি ছিল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেদিন অফিসে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারিনি।
বিকেলে সাহস করে আবার ওই রাস্তার পাশে গেলাম।
যে বাড়ির সামনে মেয়েটাকে নামিয়েছিলাম, সেখানে একটা বৃদ্ধ মহিলা থাকতেন।
আমি দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লাম।
বৃদ্ধ মহিলা দরজা খুললেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “খালা, এখানে আগে কে থাকতেন?”
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— “আমার মেয়ে থাকত।”
— “কোথায় এখন?”
মহিলার চোখে পানি চলে এল।
— “পাঁচ বছর হলো নেই।”
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।
তবুও একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল।
আমি বললাম,
— “আপনার মেয়ের কি সাদা-কালো একটা পোশাক ছিল?”
মহিলার মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— “কেন?”
আমি বললাম,
— “এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “ও মারা যাওয়ার রাতে ওই পোশাকটাই পরেছিল।”
আমার বুকের ভেতর যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।
আমি আর দাঁড়ালাম না।
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে বাইকটা গ্যারেজে রেখে দিলাম।
ঠিক করলাম, আর কখনো রাত ২টার পর ওই রাস্তা দিয়ে যাব না।
কিন্তু ঘটনার আসল ভয়টা তখনও বাকি ছিল।
পরদিন সকালে বাইক পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি, পেছনের সিটে কাদা লেগে আছে।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
কারণ আগের রাতে বাইকটা একদম পরিষ্কার ছিল।
কাদার ওপর ছোট ছোট পায়ের ছাপ।
পায়ের ছাপগুলো সিট থেকে শুরু হয়ে বাইকের পেছনের দিকে গিয়ে থেমে গেছে।
আমি কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর চোখে পড়ল—
সিটের ওপর একটা ছোট কালো কাপড়ের টুকরো।
আমি সেটা হাতে নিতে গিয়েও থেমে গেলাম।
কারণ কাপড়টা ভেজা।
আর কাপড় থেকে সেই একই ভেজা মাটির গন্ধ আসছিল।
সেদিন থেকে পাঁচ বছর কেটে গেছে।
আমি এখন আর ওই শহরে থাকি না।
কিন্তু মাঝেমধ্যে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়।
আর ঠিক তখনই আমার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে একটা কল আসে।
প্রতিবারই একই সময়—
রাত ২টা ৪৭ মিনিট।
আমি কখনো কলটা রিসিভ করি না।
কিন্তু গত মাসে এক রাতে ভুল করে কলটা ধরে ফেলেছিলাম।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ ছিল না।
তারপর খুব নিচু একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল—
“ভাইয়া… আরেকটু সামনে যাবেন?”
সেদিনের পর থেকে রাত ২টার পর আমার ফোনের রিং শুনলেই শরীর কেঁপে ওঠে।
কারণ আমি জানি—
কিছু মানুষ মারা যাওয়ার পরও হয়তো তাদের শেষ যাত্রাটা শেষ করতে পারে না।
আর তারা হয়তো আজও অপেক্ষা করে থাকে…
কোনো একজন পথিকের জন্য।
শেষ।
