রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট।
স্টেশনের ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে বারোটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পুরো প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে দূরে কোনো কুকুরের ডাক ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই।
সজীব আজ একটু দেরি করে ফেলেছে।
অফিসের জরুরি কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরতে হলে তাকে শেষ ট্রেনটিই ধরতে হবে।
স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হলো—
“ঢাকাগামী শেষ ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে।”
সজীব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত রাতে ট্রেনটিতে যাত্রী প্রায় নেই বললেই চলে।
সজীব একটি ফাঁকা কামরায় উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল।
ট্রেন ছাড়ার কয়েক মিনিট পর সে খেয়াল করল, কামরার অন্য প্রান্তে একজন মেয়ে বসে আছে।
মেয়েটির বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের মতো।
চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
সজীব কয়েকবার তাকালেও মেয়েটি একবারও তার দিকে তাকাল না।
ট্রেন অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ছুটে চলল।
হঠাৎ মেয়েটি বলল,
— “আপনি কি পরের স্টেশনে নামবেন?”
সজীব অবাক হয়ে বলল,
— “না। আমি শেষ স্টেশনে যাব।”
মেয়েটি মৃদু হাসল।
— “তাহলে আপনার ভাগ্য ভালো।”
— “কেন?”
মেয়েটি আর কোনো উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর সজীব আবার জিজ্ঞেস করল,
— “আপনি কোথায় যাবেন?”
মেয়েটি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “আমি যেখানে নামব, সেখানে আর কেউ আমাকে দেখতে পাবে না।”
সজীব ভেবেছিল মেয়েটি হয়তো কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
সে আর কথা বাড়াল না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর তার চোখে পড়ল—মেয়েটির হাতে একটি পুরোনো কাগজ।
কাগজের ওপর বড় করে লেখা—
“১২ সেপ্টেম্বর, রাত ১২টা ১৫ মিনিট।”
সজীব নিজের ফোন বের করে সময় দেখল।
১২টা ১২ মিনিট।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল।
আর তিন মিনিট পর কী হবে?
১২টা ১৩...
১২টা ১৪...
হঠাৎ ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।
পুরো কামরা অন্ধকার।
কয়েক সেকেন্ড পর আলো আবার জ্বলে উঠল।
সজীব সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির দিকে তাকাল।
কিন্তু মেয়েটি সেখানে নেই।
সে হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকাল।
কামরার দরজা বন্ধ।
জানালা বন্ধ।
কোথাও যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলো।
“তাকে খুঁজবেন না।”
সজীবের হাত কাঁপতে লাগল।
আরেকটি মেসেজ এল।
“সে আজ প্রথমবার এই ট্রেনে ওঠেনি।”
সজীব দ্রুত জানালার বাইরে তাকাল।
বাইরে অন্ধকার।
কিন্তু জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বের পাশে সে আরেকটি মুখ দেখতে পেল।
একজন মেয়ের মুখ।
সে পিছনে ফিরে তাকাল।
কেউ নেই।
আবার কাঁচের দিকে তাকাল।
মুখটিও নেই।
ট্রেন পরের স্টেশনে থামল।
দরজা খুলতেই সজীব দৌড়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে গেল।
সে স্টেশনের একজন কর্মচারীকে মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করল।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আপনি কোন কামরায় ছিলেন?”
— “তিন নম্বর কামরা।”
লোকটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— “অসম্ভব।”
— “কেন?”
লোকটি নিচু গলায় বলল,
— “এই ট্রেনের তিন নম্বর কামরাটা গত দুই মাস ধরে বন্ধ।”
সজীবের মাথা ঘুরে উঠল।
— “কী বলছেন?”
লোকটি তাকে স্টেশনের পুরোনো রেকর্ড রুমে নিয়ে গেল।
সেখানে একটি সংবাদপত্র বের করে তার সামনে রাখল।
শিরোনাম দেখে সজীবের বুক কেঁপে উঠল।
“শেষ ট্রেনে রহস্যজনকভাবে তরুণীর মৃত্যু।”
তারিখ—
১২ সেপ্টেম্বর, এক বছর আগে।
ছবির দিকে তাকিয়ে সজীব জমে গেল।
ছবিতে সেই একই মেয়ে।
যে কিছুক্ষণ আগেও তার সামনে বসে ছিল।
সংবাদে লেখা ছিল, মেয়েটির নাম নীলা। সে শেষ ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল। মাঝরাতে ট্রেনের একটি বন্ধ কামরায় তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
কিন্তু মৃত্যুর কারণ কখনো জানা যায়নি।
সজীব কাঁপা গলায় বলল,
— “এই মেয়েটা... আজ আমার সঙ্গে ট্রেনে ছিল।”
স্টেশন কর্মচারী তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আপনি কি নিশ্চিত?”
— “হ্যাঁ।”
লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
— “তাহলে হয়তো সে আপনাকে কিছু জানাতে চেয়েছে।”
সজীবের মনে পড়ল মেয়েটির কথাটা—
“তাহলে আপনার ভাগ্য ভালো।”
ঠিক তখনই তার ফোনে আবার মেসেজ এল।
এবার নম্বরটি দেখে সে আরও ভয় পেল।
মেসেজ এসেছে—
নীলা নামে সেভ করা একটি নম্বর থেকে।
মেসেজে লেখা—
“আমি মারা যাওয়ার আগে যাকে শেষবার ফোন করেছিলাম, সে এখনও বেঁচে আছে।”
সজীব কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল—
এক বছর আগে নীলার মৃত্যুর খবর সে কোথায় যেন পড়েছিল।
কিন্তু সে তো কখনো মেয়েটিকে চিনত না।
তাহলে নীলা তাকে কেন বেছে নিল?
সে মেসেজের উত্তর দিল—
“সে কে?”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।
“আপনি।”
সজীবের হাত থেকে ফোনটি পড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে স্টেশনের ঘড়িতে ১২টা ১৫ মিনিট বাজল।
দূর থেকে শেষ ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
সজীব ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাল।
ট্রেনটি আবার ফিরে এসেছে।
এবার তিন নম্বর কামরার দরজা খোলা।
ভেতরে বসে আছে নীলা।
সে জানালার পাশে বসে সজীবের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর ঠোঁট নাড়ল—
“এবার সত্যিটা মনে পড়েছে?”
সজীবের চোখের সামনে হঠাৎ এক বছর আগের একটি দৃশ্য ভেসে উঠল।
সে নিজেই সেই ট্রেনে ছিল।
সে নীলাকে চিনত।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য—
নীলার মৃত্যুর রাতে শেষবার যে মানুষটি তার সঙ্গে কথা বলেছিল, সে ছিল সজীব নিজেই।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর নিজের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ায় সে সব ভুলে গিয়েছিল।
ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল।
সজীব একা দাঁড়িয়ে রইল।
তার ফোনের স্ক্রিনে শেষ একটি মেসেজ জ্বলছিল—
“সত্যিটা মনে পড়েছে। এবার তোমার পালা।”
সেদিনের পর থেকে সজীবকে আর কেউ খুঁজে পায়নি।
শুধু প্রতি বছর ১২ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১৫ মিনিটে সেই পুরোনো স্টেশনে শেষ ট্রেনটি থামে।
আর তিন নম্বর কামরার জানালায় দেখা যায় দুজন যাত্রীকে—
একজন নীলা।
আর তার পাশে বসে থাকা একজন অচেনা যুবক।
কেউ জানে না, সে সজীব কি না।
তবে স্টেশনের পুরোনো কর্মচারীরা বলে—
প্রতি বছর তাদের একজন নতুন যাত্রীকে দেখে মৃদু হাসে।
আর সেই যাত্রীকে নাকি পরের বছর আর কখনো দেখা যায় না।
