রাত তখন প্রায় দুইটা।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি। চারদিকে নীরবতা। ঘরের এক পাশে নিজের বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রাকিব। আর ঘরের অন্য পাশে নীলার বিছানায় বসে ছিল একজন অপরিচিত পুরুষ।
লোকটির নাম আরিফ।
নীলা বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
— “তুমি এখানে এসেছ, এটা যদি রাকিব জানতে পারে?”
আরিফ নিচু গলায় বলল,
— “জানলে জানুক। এতদিন তো তোমার কথাই শুনেছি।”
নীলা অস্থির হয়ে বলল,
— “না, তুমি বুঝতে পারছ না। রাকিব সবকিছু জেনে গেছে।”
আরিফ থমকে গেল।
— “কী বলছ?”
নীলা কাঁপা গলায় বলল,
— “আজ সন্ধ্যায় সে আমাকে শুধু একটা প্রশ্ন করেছিল—‘আরিফ কে?’”
কথাটা শুনে আরিফের মুখের রং বদলে গেল।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— “তাহলে আমাকে এখনই যেতে হবে।”
কিন্তু ঠিক তখনই পাশের বিছানা থেকে রাকিবের কণ্ঠ শোনা গেল—
— “যেও না, আরিফ।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেল।
নীলা আর আরিফ দুজনেই জমে গেল।
রাকিব ধীরে ধীরে উঠে বসল। তার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই।
সে অনেকক্ষণ ধরেই জেগে ছিল।
রাকিব শান্ত গলায় বলল,
— “আমি সব শুনেছি।”
নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “রাকিব, আমাকে ক্ষমা করো…”
রাকিব কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু আরিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি জানো, আজ তোমাকে এখানে আসতে দেওয়ার আসল কারণ কী?”
আরিফ অবাক হয়ে তাকাল।
রাকিব টেবিল থেকে একটি ফাইল তুলে ধরল।
— “কারণ আমি তোমাদের দুজনের সম্পর্কের সত্যিটা জানতে চেয়েছিলাম।”
ফাইলের ভেতরে ছিল কিছু ছবি, মেসেজের কপি এবং ব্যাংক লেনদেনের তথ্য।
আরিফের মুখ শুকিয়ে গেল।
নীলা অবাক হয়ে বলল,
— “এসব তুমি কোথায় পেলে?”
রাকিব ধীরে বলল,
— “তোমার প্রেমের গল্পটা শুধু প্রেমের গল্প ছিল না, নীলা। এর পেছনে আরও বড় একটা রহস্য আছে।”
নীলা এবার ভয়ে তাকিয়ে রইল।
রাকিব ফাইলের শেষ পাতাটা সামনে রাখল।
সেখানে একটি নাম লেখা ছিল—
“সুমন”।
নামটা দেখেই নীলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সুমন ছিল নীলার ছোট ভাই।
রাকিব বলল,
— “তিন বছর আগে সুমনের ব্যবসায় যে টাকা হারিয়ে গিয়েছিল, সেই টাকার একটা অংশ আরিফের অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল। আমি এতদিন ধরে সবকিছু খুঁজছিলাম।”
আরিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “মিথ্যা! আমি কিছু করিনি।”
রাকিব আরেকটি কাগজ বের করে টেবিলে রাখল।
— “তাহলে এই লেনদেনগুলো কী?”
আরিফ কাগজটার দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল।
নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি জানতাম না। আরিফ আমাকে বলেছিল, সে শুধু আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।”
রাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “তুমি হয়তো সবটা জানতে না। কিন্তু একটা বিষয় তুমি জানতে—তুমি আমাকে প্রতারণা করছিলে।”
ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সম্পর্ক?
বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর রাকিব আর নীলার সংসার বেশ ভালোই চলছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
রাকিব কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। নীলা মনে করত, স্বামী তাকে আগের মতো সময় দেয় না।
এই সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার আরিফের সঙ্গে নীলার যোগাযোগ হয়।
আরিফ ছিল নীলার কলেজজীবনের পরিচিত।
প্রথমে তাদের কথাবার্তা ছিল পুরোনো স্মৃতি নিয়ে।
তারপর প্রতিদিন কথা বলা শুরু হলো।
আরিফ নীলাকে বলত,
— “তুমি আগের মতোই আছ।”
— “তোমার সঙ্গে কথা বললে পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ে।”
এই কথাগুলো নীলার ভালো লাগত।
ধীরে ধীরে সে নিজের সংসারের ছোটখাটো সমস্যাগুলো আরিফের সঙ্গে আলোচনা করতে শুরু করল।
আরিফও সুযোগটা কাজে লাগাল।
একদিন সে বলল,
— “তুমি যদি আমাকে বিয়ে করতে, তাহলে তোমাকে কখনো একা লাগত না।”
কথাটা নীলার মনে গেঁথে গেল।
এরপর তাদের সম্পর্ক গোপন হয়ে উঠল।
নীলা নিজের ফোন লুকিয়ে ব্যবহার করত। রাকিব ঘরে থাকলে অনেক সময় অন্য ঘরে চলে যেত। আর রাকিব প্রশ্ন করলে বলত,
— “অফিসের বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলছিলাম।”
রাকিব প্রথমে বিশ্বাস করত।
কিন্তু পরে তার সন্দেহ হতে শুরু করে।
এক রাতে নীলার ফোনে একটি মেসেজ দেখে রাকিব প্রথমবার আরিফের নাম জানতে পারে।
সে কোনো ঝগড়া করেনি।
চুপচাপ তদন্ত শুরু করে।
আর তখনই একে একে সামনে আসতে থাকে আরও কিছু তথ্য।
আরিফের আসল উদ্দেশ্য
রাকিব জানতে পারে, আরিফ শুধু নীলার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেনি। সে নীলার কাছ থেকে রাকিবের ব্যবসা ও পরিবারের আর্থিক তথ্যও জানার চেষ্টা করছিল।
নীলা না বুঝেই অনেক ব্যক্তিগত তথ্য তাকে বলেছিল।
কোন ব্যাংকে টাকা রাখা হয়, ব্যবসায় কার সঙ্গে লেনদেন হয়—এমন অনেক কথাই আরিফ জানত।
রাকিব বুঝতে পারে, বিষয়টি শুধু পরকীয়া নয়।
এর সঙ্গে অর্থের ব্যাপারও জড়িত।
তাই সে প্রমাণ সংগ্রহ করতে থাকে।
অবশেষে সেই রাতের ঘটনা ঘটল।
রাকিব ইচ্ছা করেই নীলাকে বলেছিল যে সে ঘুমাবে।
কিন্তু আসলে সে জেগে ছিল।
আরিফ যখন রাতে গোপনে ঘরে আসে, রাকিব সবকিছু শুনে ফেলে।
শেষ মুখোমুখি
রাকিব বলল,
— “আরিফ, তুমি নীলাকে ভালোবাসো কি না সেটা তোমাদের ব্যাপার। কিন্তু আমার পরিবারকে ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার চেষ্টা কেন করেছিলে?”
আরিফ কোনো উত্তর দিল না।
রাকিব বলল,
— “আমি পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। সত্যিটা বলো।”
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর আরিফ মাথা নিচু করে বলল,
— “হ্যাঁ, আমি টাকার জন্যই নীলার কাছাকাছি গিয়েছিলাম।”
নীলা যেন বজ্রাহত হলো।
— “তুমি আমাকে ভালোবাসোনি?”
আরিফ চোখ তুলল না।
— “শুরুতে হয়তো ভালো লেগেছিল। পরে বুঝলাম তোমার কাছ থেকে অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব।”
নীলার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
সে বুঝতে পারল, যে সম্পর্ককে সে ভালোবাসা ভেবেছিল, তার পেছনে স্বার্থ লুকিয়ে ছিল।
আর যে মানুষটাকে সে বিশ্বাস করেছিল, সেই মানুষই তাকে ব্যবহার করেছে।
আরিফ সেদিন চলে গেল।
রাকিবও নীলার দিকে আর তাকাল না।
ছয় মাস পরে
সেই ঘটনার পর রাকিব অন্য শহরে চলে যায়।
নীলা নিজের ভুল নিয়ে একা থাকতে শুরু করে।
সে বুঝতে পারে, রাকিব তাকে ভালোবাসত বলেই এতদিন তার ভুলগুলো ক্ষমা করেছিল।
কিন্তু বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সেটা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কত কঠিন, তা সে বুঝতে পারে।
নীলা রাকিবের কাছে বারবার ক্ষমা চেয়েছিল।
কিন্তু এবার কোনো অজুহাত দেয়নি।
সে শুধু বলেছিল,
— “আমি ভুল করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করো বা না করো, আমি আমার ভুল স্বীকার করছি।”
ছয় মাস পর এক বিকেলে রাকিব বাড়িতে ফিরে এল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নীলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
রাকিব বলল,
— “আমি ফিরে এসেছি।”
নীলার চোখে পানি এসে গেল।
— “তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “পুরোপুরি হয়তো এখনো পারিনি।”
নীলার মুখটা নিচু হয়ে গেল।
রাকিব আবার বলল,
— “কিন্তু আমি একটা সুযোগ দিতে চাই।”
নীলা অবাক হয়ে তাকাল।
— “কিসের সুযোগ?”
— “নতুন করে শুরু করার।”
নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি আর কখনো তোমার বিশ্বাস ভাঙব না।”
রাকিব বলল,
— “এবার থেকে আমাদের সংসারে কোনো গোপন ফোন থাকবে না, কোনো মিথ্যা থাকবে না।”
নীলা মাথা নাড়ল।
সেদিন রাতে ঘরে দুটি বিছানা ছিল না।
ছিল একটি বিছানা।
কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল—দুজন মানুষের মাঝখানে আবার তৈরি হওয়া বিশ্বাসের ছোট্ট একটা জায়গা।
নীলা বুঝেছিল—
পরকীয়া শুধু একটি সম্পর্ককে নষ্ট করে না, এটি একজন মানুষের নিজের কাছেও তার পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আর রাকিব বুঝেছিল—
ক্ষমা করা মানে অতীত ভুলে যাওয়া নয়; কখনো কখনো ক্ষমা মানে ভবিষ্যতের জন্য আরেকটি সুযোগ দেওয়া।
সেই রাতের পর তাদের সংসার আগের মতো হয়নি।
বরং নতুনভাবে শুরু হয়েছিল।
কারণ আগের সংসারে ছিল অভ্যাস।
আর নতুন সংসারে ছিল সত্যি কথা বলার চেষ্টা।
সমাপ্ত।
