শেষবারের মতো মায়ের হাতটা ধরেছিল ছেলেটা

 


রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।

বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু বারান্দার এক কোণে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন রাহেলার মা।

বয়স হয়েছে। চোখে আগের মতো ভালো দেখতে পান না। তবুও প্রতিদিন রাত হলে তিনি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

কারণ তাঁর একমাত্র ছেলে রাফি আজকাল আর আগের মতো বাড়ি ফেরে না।

ছোটবেলায় রাফি মাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না।

স্কুল থেকে ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে বলত,

—“মা, আজকে আমার জন্য কী রান্না করেছ?”

মা হেসে বলতেন,

—“তুই যা চাইবি, তাই রান্না করব।”

সেই ছেলেটাই বড় হয়ে একদিন মাকে বলেছিল,

—“তোমার জন্যই আমার জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে!”

কথাটা বলার পর রাফি নিজেই বুঝতে পারেনি, কথাটা মায়ের মনে কতটা গভীর দাগ কেটেছিল।

রাফির চাকরি হয়েছিল শহরে। ভালো বেতন। বিয়েও করেছিল নিজের পছন্দের মেয়েকে।

বিয়ের পর স্ত্রী প্রায়ই বলত,

—“তোমার মা আমাদের সঙ্গে থাকলে আমার খুব অস্বস্তি লাগে।”

প্রথমে রাফি প্রতিবাদ করত।

কিন্তু ধীরে ধীরে সে বদলে গেল।

মায়ের সঙ্গে কথা বলা কমে গেল।

একদিন মা খুব অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন।

রাফি অফিসে যাওয়ার সময় মা আস্তে করে বলেছিলেন,

—“বাবা, আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস। শরীরটা ভালো লাগছে না।”

রাফি বিরক্ত হয়ে বলেছিল,

—“মা, আমার কি সবসময় তোমার পাশে বসে থাকার সময় আছে?”

মা আর কিছু বলেননি।

শুধু মৃদু হেসে বলেছিলেন,

—“ঠিক আছে বাবা। তুই কাজ কর।”

সেদিন রাতে রাফি বাড়ি ফিরেছিল অনেক দেরিতে।

দেখল, মা ঘুমিয়ে আছেন।

বালিশের পাশে একটা ছোট কাগজ।

কাঁপা হাতে লেখা—

“বাবা, তোর ছোটবেলায় তুই অসুস্থ হলে আমি সারারাত জেগে থাকতাম। আজ তুই ব্যস্ত। তাই তোকে আর ডাকলাম না।”

রাফি কাগজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু পরদিন আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেল।

মানুষ অনেক সময় অনুতপ্ত হয়, কিন্তু বদলায় না।

কয়েক মাস পর রাফি মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে শহরে চলে গেল।

মা যাওয়ার সময় শুধু বলেছিলেন,

—“ভালো থাকিস বাবা। সময় পেলে একদিন আসিস।”

রাফি বলেছিল,

—“আসব মা।”

কিন্তু সেই “একদিন” আর আসেনি।

তিন মাস পর এক রাতে রাফির ফোন বেজে উঠল।

ওপাশ থেকে গ্রামের প্রতিবেশী কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—“রাফি, তুই এখনই বাড়ি আয়।”

রাফির বুকটা ধক করে উঠল।

—“কী হয়েছে?”

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর লোকটা বললেন,

—“তোর মা আর নেই বাবা।”

ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল রাফির।

সে সেদিন রাতেই গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিল।

বাড়িতে পৌঁছে দেখল, উঠানে মায়ের নিথর শরীরটা রাখা।

সাদা কাপড়ে ঢাকা মুখটা দেখে রাফি চিৎকার করে উঠল,

—“মা...!”

কিন্তু মা আর সাড়া দিলেন না।

রাফি মায়ের হাতটা ধরল।

হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা।

হঠাৎ তার মনে পড়ল ছোটবেলার কথা।

জ্বর হলে এই হাতটাই তার কপালে থাকত।

ভয় পেলে এই হাতটাই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।

স্কুলে প্রথম দিন কাঁদতে কাঁদতে মায়ের হাত আঁকড়ে ধরেছিল সে।

আজ সেই হাতটা চিরদিনের জন্য নিস্তব্ধ।

রাফি মায়ের হাত বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“মা, আমি তো আসব বলেছিলাম...”

কেউ কোনো উত্তর দিল না।

তারপর পাশের ঘর থেকে একজন বৃদ্ধ একটা পুরোনো বাক্স এনে রাফির হাতে দিলেন।

বললেন,

—“তোর মা এটা তোকে দিতে বলেছিল।”

রাফি বাক্সটা খুলল।

ভেতরে তার ছোটবেলার পুরোনো জামা, স্কুলের মেডেল, একটা ভাঙা খেলনা গাড়ি আর অনেকগুলো ছবি।

সবশেষে একটা চিঠি।

চিঠিতে লেখা—

“বাবা,

তুই যখন এই চিঠিটা পড়বি, তখন হয়তো আমি আর তোর পাশে থাকব না।

তোর ওপর আমার কোনো অভিমান নেই।

মা কখনো সন্তানের ওপর বেশি দিন অভিমান করে থাকতে পারে না।

শুধু একটা কথা মনে রাখিস—

জীবনে যত বড়ই হোস, যত টাকা-পয়সাই কামাস, এমন কাউকে যেন হারিয়ে ফেলিস না যে তোর জন্য নিঃস্বার্থভাবে অপেক্ষা করে।

আমি তোকে কখনো কিছু চাইনি।

শুধু চেয়েছিলাম, মাঝে মাঝে এসে বলিস—

‘মা, আমি ভালো আছি।’

এই কথাটুকু শুনলেই আমার পৃথিবীটা পূর্ণ হয়ে যেত।

ভালো থাকিস বাবা।

আর হ্যাঁ...

শেষবার যখন তুই আমার হাত ধরবি, তখন যেন মনে না হয় আমি তোকে ক্ষমা করিনি।

আমি তোকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি।

—তোর মা।”

চিঠিটা পড়তে পড়তে রাফির চোখের পানি থামল না।

সে মায়ের হাতটা আবার শক্ত করে ধরল।

কিন্তু এবার সেই হাত কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাফি প্রথমবার বুঝেছিল—

কিছু মানুষকে আমরা হারানোর পর ভালোবাসতে শিখি।

আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো,

যাকে ভালোবাসি তাকে একবার “ভালোবাসি” বলার সুযোগটুকুও যখন আর থাকে না।