বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে উঠেছিল মিতু।
বাড়িটা খুব একটা পুরোনো নয়।
দোতলা বাড়ি, সামনে ছোট উঠান, পাশে একটা পুকুর আর পেছনে বাঁশঝাড়।
শহরে বড় হওয়া মিতুর কাছে জায়গাটা প্রথমে বেশ ভালোই লেগেছিল।
শুধু একটা বিষয় তার ভালো লাগত না।
রান্নাঘরটা ছিল বাড়ির একেবারে পেছনে।
আর রান্নাঘরের পাশেই একটা ছোট দরজা ছিল, যেটা সবসময় বাইরে থেকে বন্ধ করে রাখা হতো।
প্রথম দিন মিতু স্বামী সজীবকে জিজ্ঞেস করেছিল,
—“ওই দরজাটা সবসময় বন্ধ থাকে কেন?”
সজীব স্বাভাবিকভাবে বলেছিল,
—“ওটা দিয়ে আগে পাশের বাড়ির লোকজন যাতায়াত করত। এখন ব্যবহার হয় না।”
মিতু আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
কিন্তু বাড়িতে ওঠার তিনদিন পর থেকেই অদ্ভুত একটা ব্যাপার শুরু হলো।
প্রতিদিন সকালে রান্নাঘরে গিয়ে মিতু দেখত—
চুলার পাশে রাখা পানির জগটা অন্য জায়গায়।
কখনো একটা প্লেট মেঝেতে পড়ে আছে।
কখনো রান্নাঘরের দরজা ভেতর থেকে খোলা।
প্রথমে সে ভাবল, হয়তো নিজেই ভুলে যাচ্ছে।
একদিন রাতে ঘুমানোর আগে মিতু রান্নাঘরের সবকিছু গুছিয়ে রাখল।
গ্যাস বন্ধ করল।
দরজা আটকে দিল।
তারপর স্বামীর সঙ্গে ঘুমাতে গেল।
সকালে উঠে দেখে—
রান্নাঘরের দরজা খোলা।
আর মেঝেতে একটা ভেজা পায়ের ছাপ।
মিতু ভয় পেয়ে সজীবকে ডাকল।
সজীব এসে পায়ের ছাপ দেখে বলল,
—“হয়তো বিড়াল বা কোনো প্রাণী ঢুকেছিল।”
মিতু বলল,
—“কিন্তু দরজা তো আমি বন্ধ করে দিয়েছিলাম।”
সজীব হেসে বলল,
—“পুরোনো দরজা। ঠিকমতো লক হয় না।”
মিতু কথাটা মেনে নিল।
কিন্তু এরপর ঘটনাগুলো বাড়তে লাগল।
একদিন রাতে সে রান্নাঘর থেকে থালাবাসনের শব্দ শুনল।
ঠং... ঠং...
মিতু বিছানা থেকে উঠে বসে স্বামীকে ডাকল।
—“সজীব, রান্নাঘরে কে?”
সজীব ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
—“কেউ না। তুমি ঘুমাও।”
শব্দ আবার হলো।
এবার একটু জোরে।
মিতু সাহস করে দরজা পর্যন্ত গেল।
রান্নাঘরে ঢুকতেই সব চুপ।
সে বাতি জ্বালিয়ে দেখল—
কেউ নেই।
শুধু জানালাটা খোলা।
পরদিন সকালে সজীব জানালাটা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু সেদিন বিকেলে মিতু রান্নাঘরে গিয়ে একটা জিনিস খেয়াল করল।
জানালার নিচে ধুলোর ওপর কারও পায়ের ছাপ।
মানুষের পায়ের ছাপ।
মিতুর বুকটা ধক করে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে সজীবকে ফোন করল।
সজীব এসে কিছুক্ষণ ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—“মিতু, তুমি কাউকে দেখেছ?”
—“না।”
—“কাউকে সন্দেহ হয়?”
মিতু মাথা নাড়ল।
সজীব তখন প্রথমবার একটু চিন্তিত হলো।
সেদিন রাতে সে ঘুমানোর আগে বাড়ির সব দরজা-জানালা নিজে পরীক্ষা করল।
সব ঠিকঠাক।
কিন্তু পরদিন সকালে আবার রান্নাঘরের দরজা খোলা।
আর এবার দরজার পাশে রাখা চালের বস্তার ওপর একটা হাতের ছাপ।
মিতু আর চুপ থাকতে পারল না।
সে পাশের বাড়ির বৃদ্ধা রহিমা খালার কাছে গেল।
সব শুনে রহিমা খালা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“তোমরা এই বাড়িটা কেনার আগে এখানে কারা থাকত জানো?”
মিতু বলল,
—“না।”
রহিমা খালা বললেন,
—“এই বাড়ির আগের মালিক ছিলেন হাশেম সাহেব। উনার একটা ছেলে ছিল। নাম রুবেল।”
—“তারপর?”
—“ছেলেটা চুরি করত। একসময় বাড়ি থেকে অনেক টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়।”
মিতু বলল,
—“তাহলে?”
রহিমা খালা নিচু গলায় বললেন,
—“কয়েক মাস পর এক রাতে সে গোপনে এই বাড়িতে ফিরে আসে।”
মিতু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
—“কেন?”
—“টাকা নিতে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বৃদ্ধা বললেন,
—“কিন্তু তার বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন না। মা একা ছিলেন। ছেলেটা রান্নাঘরের পাশের ওই ছোট দরজা দিয়ে ঢুকত।”
মিতুর চোখ হঠাৎ দরজাটার দিকে চলে গেল।
রহিমা খালা বললেন,
—“পরে রুবেলকে আর কেউ দেখেনি।”
মিতু জিজ্ঞেস করল,
—“সে কোথায় গেল?”
রহিমা খালা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“সবাই বলেছিল, সে শহরে চলে গেছে।”
মিতুর মনে তখন একটা প্রশ্ন ঘুরছিল।
যদি রুবেল শহরে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে রান্নাঘরে পায়ের ছাপ কার?
সেদিন রাতে সজীব বাড়ির পেছনে একটা ছোট ক্যামেরা বসিয়ে দিল।
ক্যামেরাটা রান্নাঘরের জানালার দিকে তাক করা।
পরদিন সকালে তারা দুজন মিলে ফুটেজ দেখতে বসল।
প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কিছুই নেই।
তারপর রাত প্রায় সাড়ে দশটার দিকে—
বাঁশঝাড়ের দিক থেকে একজন লোক ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
লোকটা মুখে কাপড় বেঁধে রেখেছে।
সে চারপাশ দেখে রান্নাঘরের পাশের ছোট দরজার কাছে গেল।
তারপর পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।
মিতু আতঙ্কে সজীবের হাত চেপে ধরল।
কিছুক্ষণ পর লোকটা বের হয়ে গেল।
কিন্তু যাওয়ার সময় ক্যামেরার দিকে একবার তাকাল।
তার মুখের কাপড়টা একটু সরে গেল।
সজীব ভিডিও থামিয়ে দিল।
দুজনেই চুপ।
মিতু ধীরে ধীরে বলল,
—“তুমি লোকটাকে চিনো?”
সজীব কোনো উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“কে?”
সজীব ফিসফিস করে বলল,
—“আমার বড় ভাই।”
মিতু হতভম্ব হয়ে গেল।
—“তোমার ভাই এখানে আসে?”
সজীব মাথা নিচু করে বলল,
—“ও এই বাড়িটা বিক্রি করার সময় বলেছিল, এখানে আর কোনোদিন আসবে না।”
পরদিন সজীব তার ভাইকে সামনে বসিয়ে সব জিজ্ঞেস করল।
প্রথমে সে অস্বীকার করল।
কিন্তু ক্যামেরার ভিডিও দেখানোর পর আর অস্বীকার করতে পারল না।
শেষে সে স্বীকার করল—
বাড়ির রান্নাঘরের মেঝের নিচে একটা পুরোনো লোহার বাক্স আছে।
বাড়ি বিক্রি করার সময় সে সেটা নিতে পারেনি।
বাক্সের ভেতরে ছিল তার বাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ আর কিছু টাকা।
তাই মাঝেমধ্যে রাতে চুপিচুপি বাড়িতে ঢুকে সেগুলো খুঁজত।
আর সেই কারণেই প্রতিদিন রান্নাঘরে অদ্ভুত শব্দ হতো।
মিতু সেদিন বুঝল—
সব ভয়ঙ্কর শব্দের পেছনে ভূত থাকে না।
কখনো কখনো থাকে একজন জীবন্ত মানুষ, যে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে আমাদের ভয়কে আরও বড় করে তোলে।
তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়।
বাক্সটা পরে সত্যিই পাওয়া গিয়েছিল।
কিন্তু বাক্সের ভেতরের একটা পুরোনো ছবিতে ছিল এমন একজন মানুষের ছবি, যাকে মিতু চিনত।
ছবির পেছনে লেখা ছিল—
“এই বাড়ির আসল মালিক।”
আর সেই মানুষটি ছিলেন...
মিতুর নিজের বাবা।
