রাত তখন প্রায় ১১টা ৪৫ মিনিট।
অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল মেহরিন।
রাস্তাটা খুব একটা নির্জন ছিল না। মাঝে মাঝে গাড়ি যাচ্ছিল, রাস্তার পাশে কয়েকটা দোকানও খোলা ছিল।
হঠাৎ একটা কালো মাইক্রোবাস এসে তার সামনে থামল।
মেহরিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন লোক গাড়ি থেকে নেমে তার মুখ চেপে ধরল।
সে প্রাণপণে চিৎকার করার চেষ্টা করল—
— “বাঁচাও!”
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে গাড়ির ভেতরে তুলে নেওয়া হলো।
গাড়িটা দ্রুত অন্ধকার রাস্তার দিকে চলে গেল।
তিন ঘণ্টা পর...
মেহরিনের ফোন বন্ধ।
বাসায় ফিরেনি।
তার মা বারবার ফোন করেও কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত থানায় খবর দেওয়া হলো।
পুলিশ মেহরিনের শেষ লোকেশন বের করার চেষ্টা করল।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল—
তার ফোনের শেষ লোকেশন দেখাচ্ছিল তার নিজের বাসার কাছেই।
অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিল, তাকে অন্য জায়গা থেকে গাড়িতে তোলা হয়েছিল।
অন্যদিকে...
একটা অন্ধকার ঘরে জ্ঞান ফিরল মেহরিনের।
তার হাত বাঁধা।
ঘরের একমাত্র জানালাটা বাইরে থেকে বন্ধ।
সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন মুখোশ পরা লোক।
লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
— “তোমাকে আমরা কোনো ক্ষতি করতে চাই না।”
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
— “তাহলে আমাকে এখানে কেন এনেছেন?”
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “কারণ তুমি এমন একটা জিনিস দেখেছিলে, যেটা তোমার দেখা উচিত ছিল না।”
মেহরিন হতভম্ব।
— “আমি কী দেখেছি?”
লোকটি উত্তর দিল না।
শুধু টেবিলের ওপর একটা ছবি রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মেহরিন ছবিটা হাতে তুলে নিল।
ছবিটা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
কারণ ছবিতে ছিল—
তার নিজের বাবা।
মেহরিনের বাবা মারা গিয়েছিলেন পাঁচ বছর আগে।
কিন্তু ছবিটা ছিল মাত্র তিন মাস আগের।
আর ছবির পেছনে লেখা—
“তোমার বাবা মারা যাননি।”
মেহরিনের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
এদিকে পুলিশ...
তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারল, মেহরিনের বাবার মৃত্যুর ঘটনাটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল, আসলে ততটা সহজ ছিল না।
পাঁচ বছর আগে তার বাবার গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল।
দেহ শনাক্ত করেছিল পরিবারের লোকজন।
কিন্তু কোনো DNA পরীক্ষা করা হয়নি।
তদন্তকারী অফিসার পুরোনো ফাইল খুলে বসতেই একটা অদ্ভুত তথ্য পেলেন।
দুর্ঘটনার আগের দিন মেহরিনের বাবা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলেছিলেন।
টাকাগুলো কোথায় গেল—
তার কোনো হিসাব নেই।
আবার মেহরিনের কাছে...
রাত আরও গভীর হয়েছে।
দরজা খুলে সেই মুখোশধারী লোকটি আবার ঘরে ঢুকল।
এবার তার হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
সে ডায়েরিটা মেহরিনের সামনে রেখে বলল,
— “এটা তোমার বাবার।”
মেহরিন ডায়েরি খুলল।
প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা সাধারণ লেখা।
তারপর একটা পৃষ্ঠায় লেখা—
“যদি কখনো মেহরিন এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে বুঝবে আমি আর নিরাপদে নেই।”
মেহরিনের চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল।
পরের লাইনে লেখা—
“আমার মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করো না।”
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমার বাবা তাহলে কোথায়?”
মুখোশধারী লোকটি এবার তার মুখের মাস্ক খুলল।
মেহরিন তাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ লোকটিকে সে খুব ভালোভাবে চেনে।
সে ছিল তার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু—আরিফ চাচা।
মেহরিন ফিসফিস করে বলল,
— “আপনি?”
আরিফ নিচু গলায় বললেন,
— “তোমাকে আমি কিডন্যাপ করিনি, মেহরিন... তোমাকে আমি বাঁচিয়েছি।”
মেহরিন কিছুই বুঝতে পারছিল না।
— “কিসের হাত থেকে?”
আরিফ জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “যারা তোমার বাবাকে পাঁচ বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে, তারা এখন তোমার পেছনেও এসেছে।”
— “কিন্তু কেন?”
আরিফ ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলে দিলেন।
সেখানে মাত্র একটা বাক্য লেখা—
“আমার মেয়ের কাছে সত্যিটা পৌঁছানোর আগেই যদি আমি মারা যাই, তাকে সেই জায়গায় নিয়ে যেও যেখানে আমাদের শেষবার দেখা হয়েছিল।”
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
— “সেই জায়গাটা কোথায়?”
আরিফ উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন—
“তোমার বাবাকে শেষবার যেখানে দেখা গিয়েছিল... সেই জায়গাটা তোমার নিজের বাড়ির নিচে।”
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
— “আমাদের বাড়ির নিচে?”
আরিফ মাথা নাড়লেন।
ঠিক তখনই বাইরে কয়েকটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
আরিফের মুখের রং বদলে গেল।
সে জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“ওরা এসে গেছে...”
মেহরিন আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কারা?”
আরিফ তার হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে বললেন—
“যাদের হাত থেকে তোমার বাবা পাঁচ বছর ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।”
দরজার বাইরে তখন—
ধাম!
একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো।
দরজা কেঁপে উঠল।
আরিফ মেহরিনের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন—
“আজ রাতেই তোমাকে তোমার বাবার কাছে পৌঁছাতে হবে।”
আর তারপর...
ঘরের সব আলো নিভে গেল।
কিন্তু আসল রহস্য তখনও বাকি...
কারণ মেহরিন জানত না—
তার বাবা আসলে কোথায় ছিলেন।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
যে মানুষটাকে সবাই পাঁচ বছর আগে মৃত ভেবেছিল, তিনি কেন নিজের মেয়েকেও সত্যিটা জানতে দেননি?
চলবে... 🔥
