সেদিন রাত থেকেই বৃষ্টি পড়ছিল।
শহরের রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো আকাশকে কয়েক মুহূর্তের জন্য সাদা করে দিচ্ছিল, তারপর আবার চারদিক অন্ধকার।
আরিফ তখন নিজের ছোট্ট ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল।
রাত প্রায় ১টা।
হঠাৎ—
ঠক... ঠক... ঠক...
দরজায় কেউ কড়া নাড়ল।
আরিফ প্রথমে ভাবল, হয়তো ভুল শুনেছে।
কিছুক্ষণ পর আবার শব্দ হলো।
ঠক... ঠক...
সে চেয়ার থেকে উঠে দরজার কাছে গেল।
— “কে?”
বাইর থেকে কোনো উত্তর এল না।
আরিফ দরজার ছোট ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকাল।
একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে গেছে। চুলগুলো মুখের ওপর লেগে আছে। হাতে একটি ছোট কালো ব্যাগ।
আরিফ দরজা খুলে দিল।
— “আপনি কে? এত রাতে এখানে?”
মেয়েটি কাঁপা গলায় বলল,
— “আমি... একটু সাহায্য চাই।”
— “আপনার বাড়ি কোথায়?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমি জানি না।”
আরিফ অবাক হয়ে গেল।
— “মানে?”
— “আমি জানি না আমি কোথায় থাকি।”
মেয়েটির কথায় অদ্ভুত অসহায়ত্ব ছিল।
আরিফ তাকে ভেতরে বসতে দিল। একটি তোয়ালে এনে দিল। তারপর এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “আপনার নামটা অন্তত মনে আছে?”
মেয়েটি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল।
— “নীরা।”
— “শুধু নীরা?”
— “হ্যাঁ।”
আরিফ পুলিশে ফোন করার কথা ভাবছিল।
কিন্তু মেয়েটি হঠাৎ তার হাত ধরে বলল,
— “দয়া করে পুলিশকে ফোন করবেন না।”
— “কেন?”
নীরা উত্তর দিল না।
বরং ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন মানুষ।
একজন বৃদ্ধ।
একজন মহিলা।
আর মাঝখানে ছোট্ট একটি মেয়ে।
আরিফ ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
— “এটা কার বাড়ি?”
নীরা ধীরে ধীরে বলল,
— “আপনার।”
আরিফের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
— “কি?”
— “এই ছবির বাড়িটা আপনার।”
আরিফ আবার ছবির দিকে তাকাল।
বাড়িটা সত্যিই তার পুরোনো বাড়ির মতো দেখতে।
কিন্তু ছবির মানুষগুলোকে সে চিনতে পারল না।
— “এটা অসম্ভব।”
নীরা বলল,
— “আপনি এই বাড়িতে ছোটবেলায় থাকতেন।”
আরিফ এবার চুপ হয়ে গেল।
কারণ সে সত্যিই ছোটবেলার অনেক স্মৃতি ভুলে গিয়েছিল।
তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সে শহরে চলে আসে। পুরোনো বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নীরার হাতে এই ছবি এল কীভাবে?
আরিফ জিজ্ঞেস করল,
— “আপনি আমাকে চেনেন?”
নীরা ধীরে মাথা নাড়ল।
— “অনেক বছর ধরে।”
— “কিন্তু আমি তো আপনাকে কখনো দেখিনি।”
নীরা মৃদু হাসল।
— “আপনি দেখেছেন। শুধু মনে নেই।”
ঠিক তখনই বাইরে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো।
ঘরের আলো কয়েকবার জ্বলে-নিভে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
অন্ধকারে নীরা বলল,
— “আপনার কাছে একটা জিনিস আছে।”
— “কী?”
— “একটা পুরোনো চাবি।”
আরিফ মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে তাকাল।
— “কোন চাবি?”
নীরা বলল,
— “যেটা আপনার বাবা মারা যাওয়ার আগে আপনাকে দিয়েছিলেন।”
আরিফের মনে হঠাৎ একটি অস্পষ্ট স্মৃতি ফিরে এল।
একজন বৃদ্ধ মানুষ তার হাতে একটি ছোট লোহার চাবি দিচ্ছেন।
আর বলছেন—
“যেদিন নীরা তোমার কাছে আসবে, সেদিন এটা খুলবে।”
আরিফের শরীর শিউরে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি নিজের পুরোনো বাক্সটি খুলল।
বছরের পর বছর ধরে সেখানে থাকা কিছু পুরোনো কাগজের নিচে সে সত্যিই একটি চাবি খুঁজে পেল।
নীরা চাবিটা দেখে বলল,
— “এবার আমাদের যেতে হবে।”
— “কোথায়?”
— “আপনার পুরোনো বাড়িতে।”
পরদিন ভোরে আরিফ ও নীরা শহরের বাইরে তার পুরোনো বাড়িতে পৌঁছাল।
বাড়িটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর পুরোনো কাঠের গন্ধ নাকে এল।
নীরা সরাসরি একটি ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
ঘরের দেয়ালের পাশে একটি পুরোনো আলমারি।
সে বলল,
— “চাবিটা এখানে লাগান।”
আরিফ চাবি ঘুরাতেই আলমারির নিচের অংশ খুলে গেল।
ভেতরে একটি ছোট লোহার বাক্স।
বাক্সের ওপর লেখা—
“আরিফের জন্য।”
আরিফ কাঁপা হাতে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে ছিল একটি চিঠি।
চিঠিটি তার বাবার লেখা।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“আরিফ,
তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো তোমার অনেক কিছুই মনে থাকবে না।
বারো বছর আগে এই বাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
সেদিন তোমার ছোট বোন নীরা নিখোঁজ হয়ে যায়।
আমরা সবাই ভেবেছিলাম সে মারা গেছে।
কিন্তু সত্যিটা অন্যরকম।
নীরা বেঁচে ছিল।
তাকে নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কারণ যে মানুষটি তাকে খুঁজছিল, সে আমাদের পরিবারের খুব কাছের একজন।
আমি তার নাম প্রকাশ করতে পারিনি।
কিন্তু একদিন নীরা নিজেই তোমার কাছে ফিরে আসবে।
সেদিন তাকে বিশ্বাস করবে।”
আরিফ চিঠি পড়া শেষ করে নীরার দিকে তাকাল।
তার চোখে পানি।
— “তুমি... আমার বোন?”
নীরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— “হ্যাঁ।”
আরিফ যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
বারো বছর ধরে সে ভেবেছিল তার কোনো ভাই-বোন নেই।
হঠাৎ তার মনে ছোটবেলার একটি দৃশ্য ফিরে এল।
একটি ছোট মেয়ে তার হাত ধরে বলছে—
“ভাইয়া, তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো?”
আরিফ চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না।
সে নীরাকে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে একটি গাড়ির শব্দ হলো।
নীরা হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল।
— “সে এসেছে।”
— “কে?”
নীরা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “যে মানুষটার জন্য আমাকে বারো বছর লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।”
গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
তারপর বাড়ির সামনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
ঠক... ঠক... ঠক...
আরিফ ও নীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
দরজার ওপাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
— “আরিফ, দরজা খোল।”
আরিফের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কারণ কণ্ঠটি তার খুব পরিচিত।
এটা ছিল তার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর কণ্ঠ।
যে মানুষটি সবাইকে বলেছিল—
নীরা বারো বছর আগে মারা গেছে।
আরিফ ধীরে ধীরে লোহার বাক্সটির দিকে তাকাল।
বাক্সের নিচে আরও একটি কাগজ ছিল।
সে কাগজটি তুলে খুলল।
মাত্র একটি লাইন লেখা—
“নীরাকে বাঁচাতে হলে প্রথমে জানতে হবে, তোমার বাবাকে কে মেরেছিল।”
বাইরে আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
এইবার আরও জোরে।
আরিফ বুঝতে পারল—
বারো বছর ধরে লুকিয়ে থাকা রহস্যের আসল গল্প মাত্র শুরু হয়েছে।
চলবে...
