রাত তখন প্রায় বারোটা।
শহরের শেষ আলোটুকুও অনেক পেছনে ফেলে রিয়াদ গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল অচেনা এক রাস্তা ধরে। রাস্তার দুপাশে বিশাল গাছ। মাঝে মাঝে হেডলাইটের আলোয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য গাছগুলোর ছায়া দেখা যাচ্ছিল, তারপর আবার সবকিছু অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল।
পাশের সিটে বসে মায়া বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেলল,
— “রিয়াদ, আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?”
রিয়াদ হেসে বলল,
— “আর একটু গেলেই বুঝবে।”
— “কিন্তু এত রাতে জঙ্গলের মধ্যে?”
— “তোমার ভয় লাগছে?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— “হ্যাঁ। একটু।”
রিয়াদ তার হাতটা ধরে বলল,
— “আমার ওপর বিশ্বাস আছে?”
মায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “আছে।”
গাড়ি আরও প্রায় দশ মিনিট চলার পর রিয়াদ একটি সরু কাঁচা রাস্তায় ঢুকল। কিছুদূর গিয়ে গাড়ি থামল।
— “এখান থেকে আমাদের হেঁটে যেতে হবে।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “আর কতদূর?”
— “বেশি না। পাঁচ মিনিট।”
দুজন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল। শহরের কোনো শব্দ নেই। শুধু বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ আর দূরে কোথাও অচেনা পাখির ডাক।
মায়া রিয়াদের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিল।
কিছুক্ষণ পর গাছের ফাঁক দিয়ে মৃদু আলো দেখা গেল।
রিয়াদ বলল,
— “চোখ বন্ধ করো।”
— “কেন?”
— “সারপ্রাইজ।”
মায়া চোখ বন্ধ করল।
রিয়াদ তাকে কয়েক পা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল,
— “এবার খোলো।”
চোখ খুলতেই মায়া অবাক হয়ে গেল।
জঙ্গলের মাঝখানে ছোট একটি খোলা জায়গা। চারপাশে ছোট ছোট আলো লাগানো। মাঝখানে টেবিল, তার ওপর মোমবাতি, খাবার আর ফুল।
মায়া কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
— “তুমি এসব করেছ?”
রিয়াদ হেসে বলল,
— “তোমার জন্মদিনে শহরের কোনো রেস্টুরেন্টে যেতে চাইনি। একটু আলাদা কিছু করতে চেয়েছিলাম।”
মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— “তুমি পাগল।”
দুজন বসে গল্প করতে লাগল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর মায়া খেয়াল করল, জঙ্গলের পরিবেশটা অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
সে ধীরে বলল,
— “রিয়াদ?”
— “হুম?”
— “আমাদের কি কেউ দেখছে?”
রিয়াদ হেসে বলল,
— “এমন মনে হচ্ছে কেন?”
— “জানি না। বারবার মনে হচ্ছে গাছের আড়াল থেকে কেউ তাকিয়ে আছে।”
রিয়াদ চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
— “ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
ঠিক তখনই—
খসখস...
তাদের পেছনের শুকনো পাতার ওপর যেন কেউ হাঁটল।
দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
রিয়াদ উঠে দাঁড়াল।
— “কে?”
কোনো উত্তর নেই।
সে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে গাছের দিকে তাকাল।
কিছুই নেই।
মায়া ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল।
— “চলো এখান থেকে চলে যাই।”
রিয়াদ বলল,
— “একটু অপেক্ষা করো।”
ঠিক তখনই মাটিতে পড়ে থাকা একটি কাগজ তার চোখে পড়ল।
সে কাগজটা তুলে নিল।
কাগজে লেখা—
“তোমরা এখানে আসবে, সেটা আমি আগেই জানতাম।”
মায়ার মুখের হাসি মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
— “রিয়াদ... এটা কে লিখেছে?”
রিয়াদ কোনো উত্তর দিল না।
কাগজটা উল্টে দেখল। পেছনে আরেকটি বাক্য।
“যাকে তুমি বিশ্বাস করছ, সে তোমাকে পুরো সত্য বলেনি।”
মায়া এবার রিয়াদের দিকে তাকাল।
— “তুমি কি কিছু লুকাচ্ছ?”
রিয়াদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— “না।”
কিন্তু তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল না।
হঠাৎ দূরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
দুজনেই চমকে উঠল।
রিয়াদ দৌড়ে গাড়ির দিকে গেল।
মায়াও তার পেছনে ছুটল।
গাড়ির কাছে গিয়ে দেখা গেল—দরজা খোলা।
আর গাড়ির ভেতরে তাদের রাখা ব্যাগটি নেই।
রিয়াদ হতভম্ব।
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”
মায়া বলল,
— “আমাদের কেউ অনুসরণ করেছে।”
ঠিক তখনই গাড়ির ভেতর থেকে ফোনের রিংটোন শোনা গেল।
রিয়াদ ফোনটি বের করে দেখল—তার নিজের ফোন নয়।
গাড়ির সিটের নিচে পড়ে আছে একটি পুরোনো মোবাইল।
স্ক্রিনে একটি ভিডিও চালু।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—একজন মানুষ দূর থেকে তাদের জঙ্গলের মধ্যে হাঁটতে দেখছে।
ভিডিওর সময়—আজ রাত ১১টা ৪৩ মিনিট।
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
— “আমরা তো তখন রাস্তায় ছিলাম...”
রিয়াদ ভিডিওটি থামিয়ে দিল।
ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
— “রিয়াদ...”
দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
কণ্ঠটা আবার শোনা গেল।
— “তুমি এখনও মায়াকে সত্যিটা বলোনি?”
মায়া ধীরে ধীরে রিয়াদের দিকে তাকাল।
— “সত্যি?”
রিয়াদ মাথা নিচু করল।
অনেকক্ষণ পর সে বলল,
— “মায়া... আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
— “কী কথা?”
— “এই জায়গাটা আমি প্রথমবার আসিনি।”
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
— “মানে?”
রিয়াদ বলল,
— “প্রায় এক বছর আগে আমার এক বন্ধু এখানে নিখোঁজ হয়েছিল।”
— “তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?”
— “কারণ আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো নিজেই কোথাও চলে গেছে।”
মায়া বলল,
— “আর আজ আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন?”
রিয়াদ উত্তর দেওয়ার আগেই জঙ্গলের ভেতর থেকে একটি টর্চের আলো দেখা গেল।
একজন মানুষ ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।
কাছাকাছি আসতেই মায়া অবাক হয়ে গেল।
লোকটিকে সে চিনতে পারল।
— “এ তো...”
রিয়াদও স্তব্ধ।
লোকটি ছিল রিয়াদের সেই বন্ধু—সজীব।
যাকে সবাই এক বছর ধরে নিখোঁজ মনে করেছিল।
সজীব তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার মুখে ক্লান্তির ছাপ।
সে বলল,
— “তোমরা দুজন এখনই এখান থেকে চলে যাও।”
রিয়াদ বলল,
— “তুই এতদিন কোথায় ছিলি?”
সজীব চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— “আমি পালিয়ে ছিলাম।”
— “কার কাছ থেকে?”
সজীব কোনো উত্তর দিল না।
তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কারণ আমি যেদিন হারিয়ে যাই, সেদিনও এখানে একজন মেয়ে ছিল।”
মায়া চমকে উঠল।
— “কে?”
সজীব বলল,
— “তার নামও ছিল মায়া।”
রিয়াদের মুখের রং বদলে গেল।
মায়া ধীরে ধীরে রিয়াদের দিকে তাকাল।
— “তুমি এই নামটা আগে শুনেছ?”
রিয়াদ চুপ।
সজীব এবার বলল,
— “রিয়াদ তোমাকে এখানে শুধু জন্মদিন উদযাপন করতে আনেনি।”
মায়া পেছনে সরে গেল।
— “তাহলে কেন?”
রিয়াদ চোখ বন্ধ করল।
তারপর বলল,
— “কারণ আমি জানতে চেয়েছিলাম এক বছর আগে আসলে কী হয়েছিল।”
হঠাৎ দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।
সজীব বলল,
— “সময় শেষ।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন পুলিশ জঙ্গলের দিকে এগিয়ে এল।
তদন্ত শুরু হলো।
পরে জানা গেল, এক বছর আগে এখানে সত্যিই একজন তরুণী নিখোঁজ হয়েছিল। ঘটনাটির সঙ্গে কয়েকজন স্থানীয় লোক জড়িত ছিল। সজীব ঘটনাটি দেখে ফেলেছিল, তাই তাকেও ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় রহস্য তখনও বাকি।
তদন্তের সময় পুলিশ জঙ্গলের আরও গভীরে একটি পুরোনো কুঁড়েঘর খুঁজে পেল।
ঘরের ভেতরে পাওয়া গেল কয়েকটি ছবি।
ছবিগুলো দেখে মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
ছবিতে মায়াকেই দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু ছবিগুলো তোলা হয়েছিল বহু বছর আগে।
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
— “এগুলো অসম্ভব... আমি তো কখনো এখানে আসিনি।”
রিয়াদ ছবিগুলো হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর ছবির পেছনে লেখা একটি তারিখ দেখে তার মুখ শুকিয়ে গেল।
তারিখটি ছিল—
বারো বছর আগের।
আর ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ছোট ছেলে।
ছেলেটিকে মায়া চিনতে পারল না।
কিন্তু রিয়াদ চিনতে পারল।
ছেলেটি ছিল...
সে নিজেই।
সেই রাতের পর রিয়াদ ও মায়া জানতে পারে, তাদের পরিবারের অতীতের সঙ্গে এই জঙ্গলের একটি পুরোনো ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে।
একটি ঘটনা, যেটা তাদের বাবা-মা দুজনেই এত বছর ধরে গোপন করে রেখেছিলেন।
আর সেই গোপন সত্যের শুরু হয়েছিল ঠিক এই জঙ্গল থেকেই।
গল্প শেষ নয়—এখান থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে আরও ভয়ংকর রহস্য।
