বিয়ের পরদিন যে কথাটা শুনে নীলা চুপ হয়ে গিয়েছিল

 


বিয়ের পরদিন সকাল।

নতুন বউ নীলা ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় বসে রইল। চারপাশে অপরিচিত একটা ঘর। দেয়ালে নতুন পর্দা, টেবিলের ওপর ফুলের তোড়া, আর বিছানার পাশে রাখা তার বিয়ের লাল শাড়িটা।

গতকাল পর্যন্ত এই ঘরটা তার কাছে অপরিচিত ছিল।

আজ থেকে এটাই তার ঘর।

এটাই তার নতুন জীবন।

নীলার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল।

সে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল, রায়হান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর।

নীলা ধীরে বলল,

— “এত সকালে উঠে গেছ?”

রায়হান ঘুরে তাকাল।

— “হ্যাঁ।”

— “কী হয়েছে?”

রায়হান কিছু বলল না।

নীলা বিছানা থেকে নেমে চুল ঠিক করতে করতে বলল,

— “কাল অনেক ধকল গেছে। তুমি আবার এত সকালে উঠে কী ভাবছ?”

রায়হান কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর বলল,

— “নীলা, তোমাকে একটা কথা বলব। কিন্তু তুমি রাগ করতে পারো।”

নীলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

— “বলো।”

রায়হান নিচের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,

— “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইনি।”

এক মুহূর্তে নীলার মুখের হাসি হারিয়ে গেল।

সে ভেবেছিল হয়তো ভুল শুনেছে।

— “কী বললে?”

রায়হান এবার তার দিকে তাকাল না।

— “আমি এই বিয়েটা চাইনি।”

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

— “তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেন?”

রায়হান বলল,

— “মায়ের জন্য।”

কথাটা নীলার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।

গতকালও এই মানুষটার হাত ধরে সে বাবার বাড়ি ছেড়ে এসেছিল।

গতকালও সে ভেবেছিল, মানুষটা হয়তো তাকে ভালোবাসে।

বিয়ের সময় রায়হান যখন তার কানে কানে বলেছিল, “ভয় পেয়ো না, আমি আছি”—তখন নীলা মনে মনে ভেবেছিল, জীবনে হয়তো তার চেয়ে ভাগ্যবান কেউ নেই।

আর আজ?

সেই মানুষটাই বলছে—

সে তাকে বিয়ে করতে চায়নি।

নীলা অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বলল,

— “আমাকে আগে বলতে পারতে।”

রায়হান চুপ।

— “বিয়ের আগেই বলতে পারতে যে তুমি আমাকে চাও না।”

রায়হান এবার বলল,

— “আমি চেষ্টা করেছিলাম।”

— “কিন্তু?”

— “মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি তোমাদের পরিবারকে কথা দিয়েছিলেন। আমি না করলে…”

রায়হান বাকিটা বলতে পারল না।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

— “তাহলে আমি তোমার কাছে একটা দায়িত্ব?”

রায়হান কোনো উত্তর দিল না।

এই নীরবতাই নীলার প্রশ্নের উত্তর হয়ে গেল।

নীলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করেও পারল না।

তার মনে হচ্ছিল, গত কয়েক মাসের সব স্বপ্ন যেন এক মুহূর্তে ভেঙে গেছে।

বিয়ের আগে কত স্বপ্ন দেখেছিল সে।

রায়হানের সঙ্গে ছোট একটা সংসার করবে।

সন্ধ্যায় দুজন বারান্দায় বসে চা খাবে।

রায়হান অফিস থেকে ফিরলে দরজা খুলে দেবে।

অসুস্থ হলে মাথায় পানি ঢেলে দেবে।

আর রায়হান হয়তো একদিন তাকে বলবে—

“তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”

কিন্তু বাস্তবতা এতটা সুন্দর ছিল না।

বাস্তবতা বলছিল—

সে এমন একজন মানুষের স্ত্রী, যে তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি।

সেদিন সারাদিন নীলা খুব কম কথা বলল।

শাশুড়ি যখন বললেন,

— “কী হয়েছে মা? শরীর খারাপ?”

নীলা মিথ্যা হাসি দিয়ে বলল,

— “না মা, একটু ক্লান্ত লাগছে।”

কেউ বুঝতে পারল না তার ভেতরে কী ঝড় চলছে।

শুধু রায়হান দূর থেকে নীলার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার চোখে একটা অপরাধবোধ ছিল।

কিন্তু নীলা আর তার দিকে তাকাল না।

রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর নীলা আলমারি খুলে একটা ছোট ব্যাগ বের করল।

ব্যাগের ভেতর থেকে একটা খাম বের করল।

খামের ওপর লেখা—

“রায়হানের জন্য।”

চিঠিটা সে বিয়ের আগের রাতে লিখেছিল।

কিন্তু দেওয়ার সাহস পায়নি।

নীলা বিছানায় বসে চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

তারপর চোখের পানি মুছে চিঠিটা খুলল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“রায়হান,

আমি জানি না তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো।

হয়তো আমার মতো করে ভালোবাসো না।

তবুও আমি তোমার সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছি।

তুমি যদি কোনোদিন আমাকে ভালোবাসতে না পারো, তবুও আমাকে অপমান করো না।

কারণ আমি তোমার কাছে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে আসিনি।

আমি শুধু চেয়েছি, তুমি আমাকে তোমার জীবনের একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করো।

যদি কোনোদিন মনে হয় আমি তোমার জীবনে বোঝা হয়ে গেছি, আমাকে বলে দিও।

কিন্তু মিথ্যা ভালোবাসা দেখিয়ে পাশে রেখো না।

মিথ্যা ভালোবাসার চেয়ে সত্যি বিচ্ছেদ অনেক কম কষ্টের।”

চিঠিটা পড়তে পড়তে নীলার চোখ ভিজে গেল।

সে চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দিল।

পরদিন সকালে রায়হান ঘুম থেকে উঠে দেখল, নীলা নেই।

সে ঘর থেকে বেরিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল,

— “নীলা কোথায়?”

মা বললেন,

— “ছাদে গেছে।”

রায়হান ছাদে গেল।

দেখল, নীলা একা দাঁড়িয়ে আছে।

তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ।

রায়হানের বুকটা কেঁপে উঠল।

— “তুমি কোথাও যাচ্ছ?”

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— “হ্যাঁ।”

— “কোথায়?”

— “বাবার বাড়ি।”

রায়হান অবাক হয়ে বলল,

— “কেন?”

নীলা এবার তার দিকে তাকাল।

চোখ দুটো লাল।

— “তুমি তো আমাকে বিয়ে করতে চাওনি।”

রায়হান চুপ করে গেল।

নীলা বলল,

— “তোমার ওপর কোনো জোর নেই। তুমি আমাকে ভালোবাসো না, সেটা আমি মেনে নিতে পারি। কিন্তু এমন একটা সংসারে আমি থাকতে পারব না যেখানে প্রতিদিন মনে হবে আমি একজন অবাঞ্ছিত মানুষ।”

রায়হান কিছু বলতে যাচ্ছিল।

নীলা হাত তুলে থামিয়ে দিল।

— “কিছু বলো না। তোমার মায়ের জন্য তুমি আমাকে বিয়ে করেছ। এখন তোমার মায়ের কথা ভেবে আমাকে আটকে রেখো না।”

রায়হানের চোখে পানি চলে এল।

— “তুমি কি সত্যিই চলে যাবে?”

নীলা মৃদু হেসে বলল,

— “যে মানুষটা আমাকে চায় না, তার কাছে থেকে কী করব?”

এই কথাটা শুনে রায়হান আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে নীলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— “আমি মিথ্যা বলেছিলাম।”

নীলা অবাক হয়ে তাকাল।

— “কী?”

রায়হান কাঁপা গলায় বলল,

— “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইনি—এটা সত্যি।”

নীলা মাথা নিচু করল।

রায়হান আবার বলল,

— “কিন্তু একটা জিনিস তুমি জানো না।”

নীলা চুপ।

— “তোমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই আমি তোমাকে পছন্দ করতাম।”

নীলা এবার অবাক হয়ে তাকাল।

রায়হান বলল,

— “তোমার সঙ্গে বিয়ের কথা যখন উঠেছিল, আমি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, তুমি হয়তো আমাকে ভালোবাসো না। শুধু পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ে করবে।”

— “তাহলে আমাকে বলোনি কেন?”

রায়হান চোখ মুছে বলল,

— “কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম।”

নীলা কিছু বলল না।

রায়হান পকেট থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।

— “এটা দেখো।”

নীলা কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল, একটা ছোট্ট লেখা।

তারিখ প্রায় এক বছর আগের।

লেখা ছিল—

“আজ বাসে একটা মেয়েকে দেখলাম। মেয়েটা জানালার পাশে বসে বই পড়ছিল। নাম জানি না। কথা বলিনি। কিন্তু কেন জানি মনে হলো, মেয়েটাকে আবার দেখতে ইচ্ছে করছে।”

নীলা অবাক হয়ে বলল,

— “এটা কার?”

রায়হান মৃদু হেসে বলল,

— “তোমার।”

নীলা কিছু বুঝতে পারল না।

রায়হান বলল,

— “যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, তুমি বাসে বসে বই পড়ছিলে। তোমাকে আমি তখন থেকেই মনে রেখেছিলাম।”

নীলার চোখে পানি চলে এল।

— “কিন্তু তুমি তো কখনো বলোনি!”

— “সাহস হয়নি।”

কিছুক্ষণ দুজনই চুপ করে রইল।

তারপর রায়হান ধীরে বলল,

— “আমি গতকাল তোমাকে ইচ্ছে করেই বলেছিলাম যে আমি তোমাকে চাইনি।”

— “কেন?”

— “কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”

— “কিসের ভয়?”

রায়হান নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,

— “তুমি যদি জানতে যে আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি, তাহলে হয়তো তোমার কাছে আমার মূল্য কমে যাবে।”

নীলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

রায়হান বলল,

— “আমি ভেবেছিলাম, একটু দূরে থাকলে হয়তো তুমি বুঝবে আমি তোমাকে কতটা চাই।”

নীলা চোখ মুছে বলল,

— “মানুষকে ভালোবাসলে তাকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে হয় না।”

রায়হান মাথা নিচু করল।

— “জানি।”

— “তুমি জানো না, গতকাল তোমার একটা কথায় আমি কতটা ভেঙে পড়েছিলাম।”

— “জানি।”

— “না, তুমি জানো না।”

রায়হান এবার নীলার হাতটা ধরল।

— “তাহলে আমাকে একটা সুযোগ দাও।”

নীলা হাত সরিয়ে নিল।

— “ভালোবাসা প্রমাণ করতে সময় লাগে।”

রায়হান বলল,

— “আমি সময় দেব।”

নীলা কিছু বলল না।

সেদিন নীলা বাবার বাড়ি যায়নি।

তবে তার মন পুরোপুরি আগের মতোও হয়নি।

পরবর্তী কয়েকটা মাস রায়হান সত্যিই বদলে গেল।

সে নীলাকে কখনো জোর করেনি।

নীলা কথা না বললে অপেক্ষা করেছে।

নীলা অভিমান করলে চুপচাপ পাশে বসে থেকেছে।

একদিন নীলা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।

রাতভর রায়হান তার পাশে বসে ছিল।

নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখল, রায়হান তার হাত ধরে ঘুমিয়ে আছে।

সেদিন প্রথমবার নীলার মনে হলো—

হয়তো মানুষটা সত্যিই তাকে ভালোবাসে।

কয়েকদিন পর নীলা সেই পুরোনো চিঠিটা বের করল।

যেটা বিয়ের আগের রাতে লিখেছিল।

চিঠিটা রায়হানের হাতে দিয়ে বলল,

— “এটা পড়েছিলে?”

রায়হান বলল,

— “না।”

— “আজ পড়ো।”

রায়হান চিঠিটা খুলে পড়ল।

পড়তে পড়তে তার চোখ ভিজে গেল।

চিঠির শেষে লেখা ছিল—

“আমি শুধু চাই, আমার স্বামী আমাকে তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ মনে করুক।”

রায়হান চিঠিটা ভাঁজ করে নীলার দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

— “আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে জীবনে আর কখনো অনিরাপদ মনে হতে দেব না।”

নীলা মৃদু হেসে বলল,

— “কথা রাখবে তো?”

রায়হান বলল,

— “শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।”

নীলা আর কিছু বলল না।

শুধু ধীরে ধীরে রায়হানের হাতটা ধরে ফেলল।

জানালার বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল।

সেই বৃষ্টির শব্দের মধ্যে দুজন মানুষ নতুন করে তাদের সংসার শুরু করেছিল।

তাদের বিয়ের শুরুটা হয়েছিল ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।

কিন্তু সেই ভুল বোঝাবুঝিই তাদের শিখিয়েছিল—

ভালোবাসা শুধু মুখে “ভালোবাসি” বলার নাম নয়।

ভালোবাসা হলো এমন একজন মানুষকে পাওয়া,

যার কাছে নিজের কষ্টগুলো লুকাতে হয় না।

যার কাছে চোখের পানি ফেলতে লজ্জা লাগে না।

আর সবচেয়ে বড় কথা—

যে মানুষটা প্রতিদিন নতুন করে আপনাকে বেছে নেয়।

নীলা সেদিন বুঝেছিল,

কখনো কখনো সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটাই হয়ে ওঠে সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর মোড়।

শেষ।