রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শহর থেকে অনেক দূরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে আরমান।
পাশের সিটে বসে তার গার্লফ্রেন্ড তানিয়া।
তানিয়া বারবার জিজ্ঞেস করছিল,
— “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
আরমান শুধু মুচকি হেসে বলছিল,
— “আর একটু গেলেই বুঝবে।”
— “এত রাতে আমাকে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছ কেন?”
— “ভয় পাচ্ছ?”
— “ভয় তো লাগছেই!”
আরমান বলল,
— “আজ তোমার জন্মদিন। তোমাকে এমন একটা গিফট দেব, যেটা তুমি সারাজীবন মনে রাখবে।”
তানিয়া আর কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল একটি ঘন জঙ্গলের সামনে।
তানিয়া গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশের অন্ধকার দেখে আঁতকে উঠল।
— “আরমান, তুমি কি পাগল? এখানে কেউ নেই!”
আরমান গাড়ির পেছন থেকে একটি ছোট ব্যাগ বের করল।
— “চলো।”
— “কোথায়?”
— “আমার সঙ্গে।”
দুজন জঙ্গলের ভেতর হাঁটতে শুরু করল।
কিছুদূর যাওয়ার পর তানিয়া লক্ষ্য করল, গাছের ডালে ছোট ছোট আলো ঝুলছে।
আরও সামনে যেতেই দেখা গেল, মাটিতে গোল করে মোমবাতি জ্বালানো।
মাঝখানে একটি টেবিল।
টেবিলের ওপর একটি সুন্দর বাক্স।
তানিয়া অবাক হয়ে বলল,
— “এসব তুমি করেছ?”
আরমান হাসল।
— “হ্যাঁ।”
তানিয়া বাক্সটির দিকে এগিয়ে গেল।
— “এর ভেতরে কী?”
আরমান বলল,
— “খুলে দেখো।”
তানিয়া বাক্স খুলতেই তার চোখ ছলছল করে উঠল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো ক্যামেরা।
ক্যামেরাটার সঙ্গে একটি ছবি।
ছবিতে তানিয়া ও আরমানের প্রথম দেখা হওয়ার দিনের মুহূর্ত।
তানিয়া অবাক হয়ে বলল,
— “এই ছবিটা তুমি কোথায় পেলে?”
আরমান বলল,
— “যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিনই ছবিটা তুলেছিলাম।”
তানিয়া মৃদু হেসে বলল,
— “তুমি এতদিন এটা রেখে দিয়েছিলে?”
আরমান মাথা নাড়ল।
কিন্তু হঠাৎ তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে বলল,
— “তবে এই গিফটটা শুধু তোমার জন্মদিনের জন্য নয়।”
তানিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “তাহলে?”
আরমান পকেট থেকে আরেকটি খাম বের করল।
— “এটা তোমার জন্য।”
তানিয়া খাম খুলে কয়েকটি কাগজ বের করল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“তানিয়ার বাবার চিকিৎসার বকেয়া টাকা—সম্পূর্ণ পরিশোধ।”
তানিয়া কিছুক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কাঁপা গলায় বলল,
— “তুমি… এগুলো কী করেছ?”
আরমান বলল,
— “তোমার বাবা যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন, তুমি কাউকে কিছু বলোনি। আমি জানতে পেরেছিলাম তুমি রাতে কাঁদতে কাঁদতে টাকা জোগাড় করছ।”
তানিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
— “তুমি আমাকে বলোনি কেন?”
— “কারণ তুমি হয়তো নিতে চাইতে না।”
আরমান ধীরে বলল,
— “তাই তোমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে এলাম, যেখানে তুমি আমাদের প্রথম দিনের কথা মনে করতে পারবে।”
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে আরমানকে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু ঠিক তখনই জঙ্গলের অন্য পাশ থেকে একটা শব্দ হলো।
খসখস…
দুজনেই চমকে উঠল।
আরমান সঙ্গে সঙ্গে তানিয়াকে নিজের পেছনে নিয়ে দাঁড়াল।
অন্ধকারের মধ্যে থেকে একজন লোক বেরিয়ে এল।
তানিয়া লোকটিকে দেখে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
— “আপনি এখানে?”
লোকটি ছিল তানিয়ার বাবা।
তানিয়া হতভম্ব হয়ে গেল।
তার বাবা হাসতে হাসতে বললেন,
— “তোমার প্রেমিক আমাকে অনেকদিন আগে সব বলেছে। আজ তোমার জন্মদিনে তোমাকে চমকে দেওয়ার পরিকল্পনাটা আমরা দুজন মিলে করেছি।”
তানিয়া আর কিছু বলতে পারল না।
সে বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগল।
সেদিন গভীর রাতে জঙ্গলের সেই নির্জন জায়গায় তানিয়া বুঝতে পারল—
আরমান তাকে শুধু একটি দামি উপহার দেয়নি।
সে তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাটাকেও নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিল।
ফেরার সময় তানিয়া গাড়িতে বসে বলল,
— “আজকের রাতটা আমি কোনোদিন ভুলব না।”
আরমান হাসল।
— “আমি তো সেটাই চেয়েছিলাম।”
তানিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসা আসলে বড় বড় কথা নয়—প্রিয় মানুষটার কষ্টটা নিজের কষ্টের মতো বুঝতে পারাটাই ভালোবাসা।”
সমাপ্ত।
